প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য্য প্রতিযোগিতা: মডার্ন ধান্দাবাজী !!!

কেউ একজন এসে বললো আমি সারা বিশ্বের দর্শনীয় স্থান নির্বাচন করবো তোমরা ওমুক নাম্বারে এসএমএস করো তাহলে এর ফল কি হবে?? অবশ্যই সেটা গ্রহনযোগ্য হবেনা। তাহলে যেটা অগ্রহনযোগ্য সেটার পিছনে কেন এত টাকা খরছ করছি আমরা ?? আমরা হয়তো অনেক টাকা ব্য্য করছিনা এককভাবে, কিন্তু সবাই মিলে যে ব্যায় করছি তাতে সেই ধোকাবাজ উদ্যোক্তা আর সেসব মোবাইল ওপারেটর হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা। কোথা থেকে কেউ একজন উড়ে এসে বসলো এই নিউসেভেনওয়ান্ডার্স নির্বাচন হবে তাতেই আপনি আমি লাফিয়ে পড়বো ভোট দিতে!!! আরো বিস্তারিত জানুন মূললেখকঃ উজায়ের ইবনে ওমর থেকে

তথাকথিত প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য্য নির্বাচনে সুন্দরবনকে বিজয়ী (?) করতে দেশে এখন মাতোম চলছে। বিষয়টা অনেকটা ‘কান নিয়ে গেছে চিলে’র মতোই ঘটনা। সবাই এই ভোটাভুটি নিয়ে দারুন ব্যস্ত। কিন্তু কেউ একবারও প্রশ্ন করছে না যে কে বা কারা কাদের এই দায়িত্ব দিয়েছে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য্য নির্বাচন করার?

সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউনেন্ডশন মূলত নেদারল্যান্ডের কিছু ধান্দাবাজ মানুষের সংগঠন। বিশ্ব নিজেদের পরিচিত করাতে বেশ কয়েক বছর আগে এরা প্রথমে পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য্য (যা আমরা ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইতে শিখেছি–তাজমহল, পিরামিড ইত্যাদি) কে পুন:নির্বাচন করলো। আর এটাই তাদের পথ করে দিলো বিশ্বজুড়ে ধান্দাবাজী করার।

মনে হতে পারে একটি সংগঠন প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য্য নির্বাচন করার উদ্যোগ নিয়েছে তাতে সমস্যাটা কী কিম্বা ধান্দাটা কী?

সমস্যাটা হচ্ছে….প্রথমত তাদের এই নির্বাচনের কোন আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। কারণ এটি কোন আন্তর্জাতিক সংগঠন নয়। এটা হলো ইন্টারনেট ভিত্তিক একটি ভূইফোড় সংগঠন। যার ফলে তথাকথিত এই ফাউন্ডেশনের তথাকথিত নির্বাচনে (কারণ এই নির্বাচনে যেসব প্রাকৃতিক স্থানের নাম প্রথম দিকে রয়েছে যেমন: আমাজন, এভারেস্ট…ব্যক্তিগত ফেসবুক আলাপচারিতায় আমি জেনেছি এসব দেশের সাংবাদিকরা এই প্রতিযোগিতার নামও শোননি আজ পর্যন্ত) যদি আমাদের প্রিয় সুন্দরবন ৭টি স্থানের একটিও হয় তাতেও কোন কিছু যাবে আসবে না। কারণ এই সেভেন ওয়ার্ন্ডস ফাউন্ডেশন নামের সংগঠনটির কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। যে সংগঠনের কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিই নেই তারা কী করে পৃথিবীর সাতটি স্থানকে স্বীকৃতি দেবে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য্য হিসেবে???????????

আর ধান্দাটা হলো এরা মানুষকে ধোকা দিয়ে এবং দেশেপ্রেম এর সেন্টিমেন্টকে এক্সপ্লয়েট করে স্রেফ ব্যবসা করছে। এসএমএস এর মাধ্যমে যে ভোট দেয়ার সুবিধা তারা বাংলাদেশ পর্যটন কপোর্রেশন এর কাছে বিক্রি করেছে মোটা টাকার বিনিময়ে। আর এই এসএমএস-এ সুযোগ দেয়া হয়েছে যত খুশি তত ভোট দেয়ার। মনে রাখবেন কোন এসএমএস প্রতিযোগিতায় একজন মানুষকে যখন যত খুশি তত ভোট দেয়ার সুযোগ করে দেয় তখন সেটি আসলে কোন সুষ্ঠু নির্বাচনই নয় বরং সেটি স্রেফ পয়সা কামানোর ধান্দা। এ ধরণের যে কোন প্রতিযোগিতায় প্রতি এসএমএস-এ কমিশন পায় আয়োজকরা।

এছাড়া গত তিন বছর ধরে এই প্রতিযোগিতার জন্য ওয়েবসাইট খুলে বিভিন্ন সুভিনির বিক্রি করছে। তারা নিজেদেরকে ব্যাপক পরিবেশ দরদী হিসেবে তুলে ধরে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য চাদাও তুলছে।

এক কথায় বলতে চাই, আমাদের সুন্দরবনের জন্য কারো সার্টিফিকেটের প্রয়োজন নেই। কারণ সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আর জাতিসংঘ সুন্দরবনকে বহু বছর আগেই ওয়ান্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই আমাদের সুন্দরবন সেভেন ওয়ান্ডর্স ফাউন্ডেশনের মতো একটি ভুইফোড় এবং অস্বীকৃত সংগঠনের ব্যবসার উপাদানে পরিণত তা কোনভাবেই মেনে নিতে পারিনা।

সূত্রঃ ফেবু নোট

 

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য প্রতিযোগিতা: পড়েছি ধরা এক ধান্দাবাজের জালে!!!

ধান্দাবাজীর প্রথম উদ্যোগ: ০৭.০৭.০৭. এই শতকের একমাত্র ‌’লাকি সেভেন’ দিবস! অর্থাৎ ২০০৭ সালের জুলাই মাসের সাত তারিখ। সুইজারল্যান্ডের ইন্টারনেট ভিত্তিক সংগঠন ‘সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন’ ঘোষণা করেছিল তাদের জরিপে (?) নির্বাচিত পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্যজনক স্থাপত্যের নাম যা তাদের ভাষায় পৃথিবীর নতুন সপ্তম আশ্চর্য (নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স অফ দ্য ওয়ার্ল্ড)। এগুলো ছিলো: মেক্সিকোর চিচেন ইতাজ, ব্রাজিলের খ্রিস্ট রিডিমার, ইতালির কলোসিয়াম, ভারতের তাজ মহল, চীনের গ্রেট ওয়াল, জর্ডানের পেট্রা এবং পেরুর মাচু-পিচু।

বাদ পড়ে গেল মিশরের পিরামিড?: তাদের জরিপের ফলে সর্বস্বীকৃত পৃথিবীর শত সহশ্র বছরের প্রাচীনতম সাতটি আশ্চর্য নিদর্শন বা স্থাপনার সবগুলোই বাদ পড়ে যায়। মিশরের পিরামিড, পিসার হেলানো টাওয়ার কিম্বা ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের মতো পৃথিবীর প্রাচীনতম স্থাপনাগুলোর কৌশল মানবজাতিকে হতবাক করে বলেই ইতিহাসে রয়েছে এদের বিশেষ স্থান। আর মধ্য এবং আধুনিক কালের পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যও রয়েছে সাধারণ জ্ঞানের পাতায়। যেগুলো বিভিন্ন সংস্থা যেমন: আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স, ইউএসএ টু’ডে, সিএনএন এর মতো প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করেছে। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের জুরিখ লেকের পাশে বসে বার্নার্ড ওয়েবার নামের এই ভদ্রলোক ফন্দি করলেন প্রাচীন, মধ্য কিম্বা আধুনিক স্বীকৃত সপ্তম আশ্চর্যের ভেতরে বা বাইরে যেসব স্থাপনা রয়েছে সেগুলোকে সারা দুনিয়ায় একটি নির্বাচন নামক প্রহসনের ভোটাভুটির মধ্যে ঠেলে দিয়ে নিজের পকেটে শতশত কোটি ডলার ভরার!

১০০ মিলিয়ন ভোট!: সেই ভাবনা থেকেই তিনি শুরু করলেন ইন্টারনেট ও মোবাইল এসএমএস-এর মাধ্যমে পপুলার ভোটের ভিত্তিতে নতুন সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের কাজ। ওয়েব সাইটের নাম দিলেন www. new7wonders.com। সুইস সরকারের অনুমোদনও নিয়ে নিলেন তিনি। পাশে পেলেন ইউনেস্কোকে (জাতিসংঘের শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা)। পরিকল্পনা মাফিক সবকিছু সম্পন্ন করে ২০০৭ সালের ৭ জুলাই সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে ঘোষণা দিল; প্রাপ্ত ১০০ মিলিয়ন ভোটের ভিত্তিতে পৃথিবীর নতুন সাতটি আশ্চর্যজনক স্থাপনা নির্বাচন করেছেন তিনি। কিন্তু তার নির্বাচিত নতুন সপ্তাশ্চর্য যতটা না আলোড়ন তুললো বোদ্ধামহলে তারচেয়ে তাদের ভাবিত করে তুললো একটি নির্বাচনে ১০০ মিলিয়ন ভোট সংগ্রহের মতো অভূতপূর্ব বিষয়টি নিয়ে।

জাল ভোট: ভোটের এই পরিসংখ্যান শুনে তাজ্জব হয়ে গেলো পৃথিবীর খ্যাতনামা নির্বাচন ও জরিপ সংস্থাগুলো। নিউ ইয়র্কের জরিপ সংস্থা জগবি ইন্টারন্যাশনাল একে ঘোষণা করলো ‘নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রেকর্ড’ (দ্যা লার্জেস্ট পোল অন রেকর্ড) হিসেবে। শুরু হয়ে গেলো এই অদৃষ্টপূর্ব ভোটাভুটির গোপন রহস্য উদঘাটনের কাজ। সূত্র: উইকিপিডিয়া

 

সন্দেহাতীতভাবে অবৈজ্ঞানিক: খোজ খবর করে তারা জানতে পারলো, ইন্টারনেট এবং এসএমএস এর মাধ্যমে পপুলার ভোট নেয়ায় একজন ব্যক্তি বা সমর্থক একাধিক কিম্বা শতাধিক কিম্বা সহশ্রাধিক ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলো সেই নির্বাচনে। আর এ কারণেই এটি পৃথিবীতে নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রেকর্ড’টি করতে পেরেছিলো। ফলে পৃথিবীর আরেক বিখ্যাত জরিপ সংস্থা ইউটিকা সেভেন ওয়ান্ডার্সের সেই নির্বাচনকে আখ্যায়িত করেছিলো ‘সন্দেহাতীতভাবে অবৈজ্ঞানিক’ (ডিসাইডেডলি আনসায়েন্টিফিক) হিসেবে। নির্বাচনের পদ্ধতি অবৈজ্ঞানিক, বিতর্কিত এবং অগ্রহণযোগ্য হওয়ায় জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো ২০০৭ সালেই নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন এর প্রতি তাদের আনুষ্ঠানিক সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় এবং তাদের

নতুন সপ্তাশ্চর্যের ফলাফলও প্রত্যাখ্যান করেছিলো। সূত্র: উইকিপিডিয়া

 

প্রতি এসএমএস-এ ওয়েবার পাবে ৬৮ পয়সা: কিন্তু ইউনেস্কো মুখ ফিরিয়ে নিলেও দমে যায়নি বার্নার্ড ওয়েবার। শ্রেফ টাকা কামানোর এই উদ্যোগকে পাকাপোক্ত করতে তিনি তার বিতর্কিত ফাউন্ডেশনকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন জাতিসংঘের পার্টনার অরগানাইজেশের খাতায়। আর এখন সন্দেহাতীতভাবে আবৈজ্ঞানিক, বিতর্কিত, অগ্রহণযোগ্য এবং প্রত্যাখ্যাত পদ্ধতিতেই পৃথিবীর সাতটি প্রাকৃতিক আশ্চর্য নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌছেছেন ওয়েবার। ২০১১ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত দেয়া যাবে এসএমএস-এ ভোট। সেল ফোনের মাধ্যমে ভোট দেয়ার সুযোগ করে দিতে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন দেশের সরকারী টেলিফোন সংস্থা বিটিসিএল তথা টেলিটক এর সাথে চুক্তি করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী সুন্দরবনকে এসএমএস এর মাধ্যমে দেয়া প্রতিটি ভোটের বিপরীতে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন তথা বার্নার্ড ওয়েবার পাবে ৬৮ পয়সা করে।

এসএমএস-এর মাধ্যমে ওয়েবারের হাতে যাবে ৬৮ কোটি টাকা: গত ৯ জুলাই ২০১১ তে দি ডেইলি স্টার পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় যার শিরোনাম ছিলো ‘দুই সপ্তাহে ১০ লাখ ভোট’ । গত ২৪জুন থেকে এসএমএস-এর মাধ্যমে সুন্দরবনের জন্য ১০ লাখ ভোট পড়েছে বলে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে। আর এই এসএমএস চুক্তিকারী কর্তৃপক্ষ টেলিটক এর কর্মকর্তার উদ্বৃতি দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি মোবাইল গ্রাহক যদি অন্তত ২০টি করে ভোট দেয় তবে সুন্দরবনের জন্য ভোটের সংখ্যা দাড়াবে কমপক্ষে ১০০ কোটি। আর এই একশ কোটি ভোট পড়লে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন তথা বর্নার্ড ওয়েবার আয় করবে ৬৮ কোটি টাকা। কেননা চুক্তি মোতাবেক প্রতি এসএমএস-এ বার্নার্ড পাবে ৬৮ পয়সা। আর যেহেতু ১০ লাখ ভোট ইতোমধ্যেই পড়েছে তাই এরই মাঝে বার্নার্ড বাংলাদেশ থেকে আয় করেছে (হাতিয়ে নিয়েছে!) ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

সুন্দরবন বাদ: কিন্তু টেলিটক এর সাথে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন যে এসএমএস চুক্তি করেছে সেই চুক্তির ৯ নম্বর ধারায় বলা আছে যে এসএমএস-এর মাধ্যমে কত ভোট পড়ছে তা পুরোপুরি গোপন রাখতে হবে। গণমাধ্যমে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ পেলে প্রতিযোগী স্থানটি তথা সুন্দরবন বাদ পড়ে যাবে প্রতিযোগিতা থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন গোপন রাখতে হবে এসএমএস এর মাধ্যমে দেয়া ভোটের পরিসংখ্যান? উত্তরটা খুব সোজা। যেহেতু সংগঠনটির এই এসএমএস বাণিজ্যের কারণে তাদের নির্বাচন পদ্ধতি অগ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়ে ২০০৭ সালের নতুন সপ্তাশ্চর্য্য’র প্রতিযোগিতাটি বিতর্কিত হয়ে পড়েছিল এবং ইউনেস্কো সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলো তাই এবার এই বিশেষ সাবধানতা। তারা চায় না এসএমএস এর ভোটের পরিসংখ্যান গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে আবারো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবারের ব্যবসা ভন্ডুল হয়ে যাক।

 

টেলিটককে শো-কজ: কিন্তু থলের বেড়াল তো এরই মাঝে বেড়িয়ে পড়েছে। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে তো ইতোমধ্যেই ২ সপ্তাহের ভোটের পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এখন কী হবে? জানা গেছে ৯ তারিখে সংবাদটি প্রকাশিত হবার পরদিন ১০ জুলাই’তে টেলিটকের চুক্তি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে চিঠি দিয়েছে সেই সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন। তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে চুক্তির শর্ত মোতাবেক এসএমএস এ ভোটের পরিসংখ্যান গোপন রাখতে বলা হলেও কী করে তা বাংলাদেশের একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হলো। এই গোপন-গোপন খেলায় এসএমএস-এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচার করে নেয়ার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই কী করে?

 

স্পন্সরশিপের দাম সাড়ে তিন লাখ ডলার: এবার আসুন সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন এর দ্বিতীয় আরেকটি ব্যবসার গোপন কথায়। এই সংগঠনটি লাখ লাখ ডলারের বিনিময়ে বিভিন্ন বেসরকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রচারণা তথা বিজ্ঞাপনের স্পন্সরশিপ বিক্রি করছে। অর্থাৎ যদি কোন বেসরকারী বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তার দেশের প্রতিযোগী কোন একটি স্থানকে নির্বাচিত করার জন্য দেশে কিম্বা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারণা চালাতে চায় তাহলে সেজন্য সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন এর কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে তার অধিকার লাভ করতে হবে। এজন্য তারা দুই ধরণের স্পন্সরশিপ এর ব্যবস্থা রেখেছে। ২ লাখ ১০ হাজার ডলারের বিনিময়ে গোল্ড স্পন্সরশিপ এবং ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে প্লাটিনাম স্পন্সরশিপ।

যেমন কোরিয়ার জোজু দ্বীপের জন্য দেশটির দুটি স্বনামধন্য কোম্পানি হুন্দাই কর্পোরেশন এবং কিয়া মটরস মোটা টাকার বিনিময়ে স্পন্সরশিপ কিনেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সুখবরটি হলো আমাদের দেশের কোন কোম্পানি সংগঠনটির কাছ থেকে এখন পর্যন্ত স্পন্সরশিপ কেনেনি। কিন্ত দেশের অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানই সুন্দরবনকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। কিন্তু স্পন্সরশিপ না কিনে এই প্রচারণা চালালে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন এর নিয়ম অনুযায়ী, চুক্তির শর্ত ভঙ্গের দায়ে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়বে সুন্দরবন। বিষয়টি সুন্দরবনের সরকারী সমর্থক সংস্থা বাংলাদেশ পর্যটন সংস্থার নজরে এসেছে এবং স্পন্সরশিপ বিহীন এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সুন্দরবনের জন্য প্রচারণা না চালাতে সতর্ক করে দিতে চিঠি ইস্যু করছে।

 

হাজার কোটি টাকার ধান্দা: কিন্তু এরপর বাংলাদেশের এক বা একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যদি এই প্রচারণার জন্য স্পন্সরশিপ কেনে তবে দুই লাখ ১০ হাজার কিম্বা সাড়ে তিন লাখ ডলার করে প্রতি স্পন্সরশিপ বেচে বাংলাদেশ থেকে হাতিয়ে নেবে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন তথা বার্নার্ড ওয়েবার। আর প্রতিযোগিতার ফাইনালিস্ট ২৮টি দেশের মধ্যে যদি গড়ে একটি করে স্পন্সরশিপ বিক্রি করতে পারে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন তবে এই খাত থেকে তার আয় দাড়াবে গড়ে ১০০ কোটি টাকা। আর প্রতিযোগী ২৮টি দেশের প্রত্যেকটি থেকে যদি ৫০ কোটি করে এসএমএস ভোট পায় তবে এই খাত থেকে বার্নার্ড আয় করবে ৩২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (প্রতি এসএমএস ৬৮ পয়সা হিসাবে)। কিন্তু ধনী দেশেগুলো থেকে এসএমএস-এর মাধ্যমে পাওয়া হিস্যা আরো বেশি হবে। সেক্ষেত্রে মুনাফার পরিমান আরো বেশি। আহ্ তথ্য প্রযুক্তি আর নতুন আইডিয়া; এই দুই যদি মিলে যায় খাপেখাপ তবে তাকে আর ঠেকায় কে?

 

বন্দী আমরা ধান্দাবাজীর জালে: তাহলে কী দাড়াচ্ছে? বার্নার্ড ওয়েবারের ওয়েবে তথা ধান্দাবাজীর জালে ধরা পড়েছি আমরা। এই মানুষটি পাঁচ বছর আগে ২০০৭ সালে কক্সবাজার ও সুন্দরবনকে পৃথিবীর অন্য ৪৪০টি স্থানের মধ্যে রেখে শুরু করেছিল পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন প্রতিযোগিতা। আর আমরা দেশ দরদী হয়ে, পৃথিবীর বুকে নিজের সুন্দরবনকে জায়গা করে দেয়ার এক ভ্রান্ত বাসনা থেকে সেই জালে আমরা পা দিয়েছি আমরা।

 

নির্বাচনের মাপকাঠি যেখানে শুধুই টাকা: ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে দুই বছর ধরে ইন্টারনেটে ভোট দেয়ার পর ২০০৯ সালে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন বললো যে কক্সবাজার বাদ পড়েছে প্রতিযোগিতা থেকে আর সুন্দরবন টিকে গিয়েছে। শেষ ধাপের এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের আরো ২৮টি প্রাকৃতিক স্থানও রয়েছে। এখন এসএমএস এবং ইন্টারনেটে ভোটাভুটির পর ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর বার্নার্ড ঘোষণা করবে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়া ২৮টির মধ্য থেকে ৭টি শ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক স্থানের নাম। কিন্তু এই সপ্তাশ্চর্য হবে কীসের বিচারে? স্থানটির সৌন্দর্য্য বিচারের মাধ্যমে? স্থানটির বিশেষ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ঠ্যের কারণে? স্থানটির জীব বৈচিত্র্যের কারণে? না এগুলো কোনটাই না। শ্রেষ্ঠত্ব বিচার হবে শ্রেফ টাকার বিনিময়ে। এসএমএস আর স্পন্সরশিপ কেনার মাধ্যমে যে ৭টি দেশ বার্নার্ড ওয়েবারের সুইস ব্যাংকের একাউন্টে সবচেয়ে বেশি ডলার রাখতে পারবে, এমন সাতটি দেশের প্রাকৃতিক স্থানই এগিয়ে যাবে প্রতিযোগিতায়। হবে পৃথিবীর তথাকথিত সেরা ৭টি প্রাকৃতিক আশ্চর্যজনক স্থানের একটি। অন্যদের ভ্রান্ত ও অগ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিয়ে নিজের পকেট ভরার কী আয়োজন! সত্যি সেলুকাস; এ পৃথিবী অবাক চেয়ে রয়!!!

 

হেই ওয়েবার, প্লিজ লিভ আস: তাই যে কথাটি আবারো বলতে চাই তা হলো; আমাদের সুন্দরবনের জন্য কারো সার্টিফিকেটের প্রয়োজন নেই। কারণ সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আর জাতিসংঘ তথা ইউনেস্কো সুন্দরবনকে ১৯৯৬ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই আমাদের সুন্দরবন সেভেন ওয়ান্ডর্স ফাউন্ডেশনের মতো একটি ভুঁইফোড় এবং অস্বীকৃত সংগঠনের ব্যবসার উপাদানে পরিণত তা কোনভাবেই মেনে নিতে পারিনা।

সূত্রঃ ফেবু নোট

 

আমদের জাল ভোটে বার্নার্ড ওয়েবারের মুখের হাসি বিস্তৃত হচ্ছে

কয়েকটা কথা বলি মন দিয়ে শুনুন। পৃথিবীতে নানা রকম সেভেন ওয়ান্ডার্স আছে। প্রচীন, মধ্যযুগ, আধুনিকযুগের সপ্তম আশ্চর্য। আছে সাগরের সপ্তম আশ্চর্য। আছে বিভিন্ন দেশের যেমন: কানাডার সপ্তম আশ্চর্য। কিন্তু এই সব আশ্চর্য নির্বাচনে কখনও জাল ভোট (যত খুশি তত ভোট) দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি। জাল ভোট মানেই জনমতের সঠিক প্রতিফলন নয়। আর এই নির্বাচনে জাল ভোটের সুযোগ যেমন দেয়া হয়েছে তেমনি চুক্তি করে ঠিক করা হয়েছে এই জাল ভোটের পরিমান কোনভাবেই ফাঁস করা যাবে না। করলে সুন্দরবন বাদ।

আর ভাবছেন এই প্রতিযোগিতায় জাল ভোট দিয়ে সুন্দরবনকে ৭টার একটা করতে পারলেই কেল্লা ফতে? কোন লাভ নেই। এমন সেভেন ওয়ান্ডার অব ন্যাচারও রয়েছে পৃথিবীতে (উইপিডিয়াতে সার্চ দিলেই পাবেন) যারা সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করেছে সেগুলোকে কোন জাল ভোটের ভিত্তিতে নয়। এইসব সপ্তম আশ্চর্যের নামই কয়জন জানে দুনিয়াতে? আর এই জোচ্চরদের নির্বাচিত সপ্তম আশ্চর্য মেনে নেবে সবাই? যারা যত খুশি তত এসএমএস-এর বিধান রাখে এসএমএস প্রতি ৬৮ পয়সা করে কামায়! যারা যত খুশি তত ফোন ভোটের বিধান রেখে পারসেনেটজ কামায়! যাদের এই পয়সা কামানোর আর ধান্দার নির্বাচনকে ২০০৭ সালেই ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে ‌’ডিসাইডেডলি আনসায়েন্টেফিক’ (সন্দেহাতীতভাবে অবৈজ্ঞানিক) হিসেবে এবং প্রত্যাখান করেছে তাদের আগের সপ্তাশ্চর্য প্রতিযোগিতার ফলাফল।

বিষয়টা হচ্ছে আপনার আমাদের কাছে দেশপ্রেম আর সেভেন ওয়ান্ডার্সের মালিক বার্নার্ড ওয়েবারের কাছে শুধুই টাকা। আমি আমার আগের লেখায় হিসাব করে দেখিয়েছি এই ধান্দাবাজীর নির্বাচন করে ওয়েবার ২৮টি দেশ থেকে হাতিয়ে নেবে সাড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা!!! আমরা যদি সচেতন না হই আমাদের মতো গরীব দেশ থেকে ও হাতিয়ে নেবে আমাদের কষ্টার্জিত ১০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। সবাইকে কেমন দেশপ্রেমের প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিয়ে ওয়েবার কতটা আয়েশ করে পয়সা কামাচ্ছে একবার ভেবেছেন???

আর নায়ক-নায়িকারা এই প্রতিযোগিতার জন্য ভোট চাইছে কিম্বা গণ্যমান্য লোকেরা ভোট চাইছে এই প্রতিযোগিতার জন্য? টাকা দিলেই পাওয়া যায় নায়ক-নায়িকা। সাড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকার ধান্দার জন্য নায়ক-নায়িকা কিম্বা গণ্যমান্যদের পেছনে বা মিডিয়ার পেছনে কিছু খরচ করবে না ওয়েবার, লোকটাকে এত বোকা ভেবেছেন নাকি???

শুনুন, বিষয়টা ভাবুন। আপনি ভোট দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী প্রতি শুক্রবারের পুরো দিনটিই খরচ করেন সুন্দরবনকে ভোট দিতে। এইদিন তিনি অন্তত ৫০০টি এসএমএস ভোট দেন (৩ তারিখের ডেইলি স্টার পড়ুন)। দৃশ্যটা একবার ভাবুন; প্রধানমন্ত্রী ভোট দিচ্ছেন, আমরা ১৬ কোটি মানুষ ভোট দিচ্ছি। আমরা যত জাল ভোট দিচ্ছি বার্নার্ড ওয়েবারের মুখের হাসি ততই বিস্তৃত হচ্ছে। কারণ ততই বাড়ছে তার সুইস ব্যাংকের একাউন্টে ডলারের পরিমান। আর বোকা হচ্ছি আমরা!!!

সূত্রঃ ফেবু নোট

 

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য্য নির্বাচনে ভোট দেব না: বাংলাদেশ ও সুন্দরবনকে বিশ্বের কাছে অপমান করব না

সুন্দরবন নিয়ে ধান্দাবাজী সংক্রান্ত লেখালেখির জন্য বেশিরভাগ মানুষকে আমাকে সমর্থন দিয়েছে পাশে দাড়িয়েছে সেজন্য আমি আমি তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু তিন থেকে চারজন ব্যক্তি এত বাজে ভাষায় মন্তব্য করেছেন তাতে আমার সন্দেহ তীব্র হয়েছে এই মানুষগুলো নিশ্চয়ই ঐ ধান্দাবাজ সংগঠনটির বেনেফিশিয়ারি। তাদের প্রতিক্রিয়া পড়ে যে কোন বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, আমার লেখালেখির কারণে জাল ভোটের জমজমাট ব্যবসায় ভাটা পড়তে পারে এবং আমার লেখালেখির কারণে তাদের টু পাইস কামিয়ে নেয়ার ধান্দাও ভন্ডুল হয়ে যেতে বসেছে।

যারা বলছে বা মনে করছে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন আমাদের সুন্দরবনকে বিশ্বে বিরাট পরিচিতি এনে দেবে তারা শ্রেফ দিবা স্বপ্ন দেখছেন। কারণ সংগঠনটির এই জাল ভোট বাণিজ্যের কারণে একটা কুখ্যাত সংগঠনে পরিণত হয়েছে। প্রথম সেভেন ওয়ান্ডার্স নির্বাচনের পর পপুলার ভোটের এই পদ্ধতি দেখে বিশ্বের বিখ্যাত জরিপ সংস্থা জগবি ইন্টারন্যাশনাল একে উপহাস করেছিলো ‌দি লার্জেস্ট পোল অন আর্থ এবং সমালোচনা করেছিলো ডিসাইডেডলি আনসায়েন্টেফিক হিসেবে। সেই ২০০৭ সালেই ইউনেস্কোও প্রত্যাহার করেছিল সেভেন ওয়ান্ডার্সকে দেয়া সমর্থন। সুতরাং কুখ্যাত এই সংগঠনটি আবারো জাল ভোট ব্যবসায় মেতেছে আর বাংলাদেশকে বানিয়েছে নাম্বার ওয়ান বলদ। আলেক্সাতে খোজ নিয়ে দেখেন সেভেন ওয়ান্ডার্স-এর ওয়েবসাইটে যত হিট হয় তার ৪০% ই হয় শুধু বাংলাদেশ থেকে। ভারত থেকে হয় মাত্র ৬%। প্রতিযোগী বাকি ২৭টি দেশ সব মিলিয়ে হিট করে বাকি ৫০-৫২%। এই এসএমএস-এ জাল ভোট দেয়ার মওকা একমাত্র বাংলাদেশ নিয়েছে। ভারত নেয়নি। নেয়নি মালদ্বীপও। জাল ভোট দেয়ার মওকা নিয়ে একটি স্থানকে প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ান করা কত বড় মানসিক দৈন্যতার পরিচয় এই প্রশ্নটিই আমি বিবেকবান সব মানুষের কাছে রেখেছি। এর বেশি কিছু নয়। আমি নৈতিকতার পক্ষে আর আমি নিশ্চিত নীতির জয় অবশ্যম্ভাবী।

এই আয়োজনটার পেছেন বার্নার্ড ওয়েবার নামে এক ভদ্রলোক কাজ করলেও আইডিয়াটা ছিলো এক মাস্টার মাইন্ডের। যার নাম ফিলিপ কোটলার। এই মানুষটা এত মেধাবী যে পৃথিবীর যে কোন জিনিসকে পণ্য বানিয়ে টাকা কামাতে পারে। তালিকাভুক্ত সেভেন ওয়ান্ডার্স দুনিয়াতে অনেক আছে। কিন্তু এইটা নিয়ে কেউ পয়সা কামানোর ধান্দা করেনি। করেছে এই সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন। আর তাই তার এত জাকজমক আয়োজন। নামী দামী স্টার ভাড়া করে প্রচারণা চালানো থেকে শুরু করে বিশ্বের খ্যাতনামা মিডিয়াগুলোকে পাশে নেয়া সবই করেছে এই সংগঠনটি। এমনকি আমাদের দেশের একটা মিডিয়াও এই সংগঠনের এজেন্ট। আর এইসব স্টার ও খ্যাতনামা মিডিয়া ম্যানেজ করা বার্নার্ডের পক্ষে ততটা সহজ না হলেও ফিলিপ কোটলারের জন্য ভাত মাছ।

যারা সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে নীতি বিসর্জন দিয়ে অনৈতিকতার পথ অবলম্বন করে বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে মানসিকভাবে কুলাঙ্গার এবং অপরিপক্ক হিসেবে পরিচিত করাতে উঠে পড়ে লেগেছে তাদেরকে ধিক্কার জানাই এবং যারা জাল ভোট দিয়ে সুন্দরবনের মহিমাকে ধুলিস্মাৎ করার চক্রান্ত রুখে দিতে চান তাদের অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে জানাই ধন্যবাদ জানাই সাধুবাদ।

সূত্রঃ ফেবু নোট

 

 

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য প্রতিযোগিতা: পড়েছি ধরা মাকড়শার জালে

০৭.০৭.০৭। এই শতকের একমাত্র ‌’লাকি সেভেন’ দিবস! অর্থাৎ ২০০৭ সালের জুলাই মাসের সাত তারিখ। সুইজারল্যান্ডের ইন্টারনেট ভিত্তিক সংগঠন ‘সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন’ ঘোষণা করেছিল তাদের জরিপে (?) নির্বাচিত পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্যজনক স্থাপত্যের নাম যা তাদের ভাষায় পৃথিবীর নতুন সপ্তম আশ্চর্য (নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স অফ দ্য ওয়ার্ল্ড)। এগুলো ছিলো: মেক্সিকোর চিচেন ইতাজ, ব্রাজিলের খ্রিস্ট রিডিমার, ইতালির কলোসিয়াম, ভারতের তাজ মহল, চীনের গ্রেট ওয়াল, জর্ডানের পেট্রা এবং পেরুর মাচু-পিচু।

তাদের জরিপের ফলে সর্বস্বীকৃত পৃথিবীর শত সহশ্র বছরের প্রাচীনতম সাতটি আশ্চর্য নিদর্শন বা স্থাপনার সবগুলোই বাদ পড়ে যায়। মিশরের পিরামিড, পিসার হেলানো টাওয়ার কিম্বা ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের মতো পৃথিবীর প্রাচীনতম স্থাপনাগুলোর কৌশল মানবজাতিকে হতবাক করে বলেই ইতিহাসে রয়েছে এদের বিশেষ স্থান। আর মধ্য এবং আধুনিক কালের পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যও রয়েছে সাধারণ জ্ঞানের পাতায়। যেগুলো বিভিন্ন সংস্থা যেমন: আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স, ইউএসএ টু’ডে, সিএনএন এর মতো প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করেছে। আর বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন বিষয় বা বস্তু (যেমন: সমুদ্র তলদেশ, প্রকৌশল, নাটক, সিনেমা এমনকি দেশভিত্তিক) সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন করেছে নানা কারণে। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের জুরিখের বার্নার্ড ওয়েবার নামের এই ভদ্রলোক ফন্দি করলেন সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের নামে দুনিয়াকে এমন একটি প্রহসনের ভোটাভুটির মধ্যে ঠেলে দিতে যাতে নিজের পকেট ভরে ওঠে শতশত কোটি ডলারে।

সেই ভাবনা থেকেই তিনি শুরু করলেন ইন্টারনেট ও মোবাইল এসএমএস-এর মাধ্যমে পপুলার ভোটের ভিত্তিতে নতুন সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের কাজ। ওয়েব সাইটের নাম দিলেন www. new7wonders.com। সুইস সরকারের অনুমোদনও নিয়ে নিলেন তিনি। পাশে পেলেন ইউনেস্কোকে (জাতিসংঘের শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা)। পরিকল্পনা মাফিক সবকিছু সম্পন্ন করে ২০০৭ সালের ৭ জুলাই সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে ঘোষণা দিল; প্রাপ্ত ১০০ মিলিয়ন ভোটের ভিত্তিতে পৃথিবীর নতুন সাতটি আশ্চর্যজনক স্থাপনা নির্বাচন করেছেন তিনি। কিন্তু তার নির্বাচিত নতুন সপ্তাশ্চর্য যতটা না আলোড়ন তুললো বোদ্ধামহলে তারচেয়ে তাদের ভাবিত করে তুললো একটি নির্বাচনে ১০০ মিলিয়ন ভোট সংগ্রহের মতো অভূতপূর্ব বিষয়টি নিয়ে।

ভোটের এই পরিসংখ্যান শুনে তাজ্জব হয়ে গেলো পৃথিবীর খ্যাতনামা নির্বাচন ও জরিপ সংস্থাগুলো। নিউ ইয়র্কের জরিপ সংস্থা জগবি ইন্টারন্যাশনাল একে ঘোষণা করলো ‘নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রেকর্ড’ (দ্যা লার্জেস্ট পোল অন রেকর্ড) হিসেবে। শুরু হয়ে গেলো এই অদৃষ্টপূর্ব ভোটাভুটির গোপন রহস্য উদঘাটনের কাজ। সূত্র: উইকিপিডিয়া

খোজ খবর করে তারা জানতে পারলো, ইন্টারনেট এবং এসএমএস এর মাধ্যমে পপুলার ভোট নেয়ায় একজন ব্যক্তি বা সমর্থক একাধিক কিম্বা শতাধিক কিম্বা সহশ্রাধিক ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলো সেই নির্বাচনে। আর এ কারণেই এটি পৃথিবীতে নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রেকর্ড’টি করতে পেরেছিলো। ফলে পৃথিবীর আরেক বিখ্যাত জরিপ সংস্থা ইউটিকা সেভেন ওয়ান্ডার্সের সেই নির্বাচনকে আখ্যায়িত করেছিলো ‘সন্দেহাতীতভাবে অবৈজ্ঞানিক’ (ডিসাইডেডলি আনসায়েন্টিফিক) হিসেবে। নির্বাচনের পদ্ধতি অবৈজ্ঞানিক, বিতর্কিত এবং অগ্রহণযোগ্য হওয়ায় জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো ২০০৭ সালেই নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন এর প্রতি তাদের আনুষ্ঠানিক সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় এবং তাদের নতুন সপ্তাশ্চর্যের ফলাফলও প্রত্যাখ্যান করেছিলো। সূত্র: উইকিপিডিয়া

কিন্তু জাতিসংঘ মুখ ফিরিয়ে নিলেও দমে যায়নি বার্নার্ড ওয়েবার। তার সেই বিতর্কিত, অগ্রহণযোগ্য এবং প্রত্যাখ্যাত পদ্ধতিতেই এবার তিনি পৃথিবীর সাতটি প্রাকৃতিক আশ্চর্য নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌছেছেন। ২০১১ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত দেয়া যাবে এসএমএস-এ ভোট। সেল ফোনের মাধ্যমে ভোট দেয়ার সুযোগ করে দিতে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন দেশের সরকারী টেলিফোন সংস্থা বিটিসিএল তথা টেলিটক এর সাথে চুক্তি করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী সুন্দরবনকে এসএমএস এর মাধ্যমে দেয়া প্রতিটি ভোটের বিপরীতে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন তথা বার্নার্ড ওয়েবার পাবে ৬৮ পয়সা করে। আর টেলিফোনের মাধ্যমে ভোট দিলে ভোট প্রতি বার্নার্ডের পকেটে যাবে …টাকা।

গত ৯ জুলাই ২০১১ তে দি ডেইলি স্টার পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় যার শিরোনাম ছিলো ‘দুই সপ্তাহে ১০ লাখ ভোট’ । গত ২৪জুন থেকে এসএমএস-এর মাধ্যমে সুন্দরবনের জন্য ১০ লাখ ভোট পড়েছে বলে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে। আর এই এসএমএস চুক্তিকারী কর্তৃপক্ষ টেলিটক এর কর্মকর্তার উদ্বৃতি দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি মোবাইল গ্রাহক যদি অন্তত ২০টি করে ভোট দেয় তবে সুন্দরবনের জন্য ভোটের সংখ্যা দাড়াবে কমপক্ষে ১০০ কোটি। আর এই একশ কোটি ভোট পড়লে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন তথা বর্নার্ড ওয়েবার আয় করবে ৬৮ কোটি টাকা। কেননা চুক্তি মোতাবেক প্রতি এসএমএস-এ বার্নার্ড পাবে ৬৮ পয়সা। আর যেহেতু ১০ লাখ ভোট ইতোমধ্যেই পড়েছে তাই এরই মাঝে বার্নার্ড বাংলাদেশ থেকে আয় করেছে (হাতিয়ে নিয়েছে!) ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

কিন্তু টেলিটক এর সাথে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন যে এসএমএস চুক্তি করেছে সেই চুক্তির ৯ নম্বর ধারায় বলা আছে যে এসএমএস-এর মাধ্যমে কত ভোট পড়ছে তা পুরোপুরি গোপন রাখতে হবে। গণমাধ্যমে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ পেলে প্রতিযোগী স্থানটি তথা সুন্দরবন বাদ পড়ে যাবে প্রতিযোগিতা থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন গোপন রাখতে হবে এসএমএস এর মাধ্যমে দেয়া ভোটের পরিসংখ্যান? উত্তরটা খুব সোজা। যেহেতু সংগঠনটির এই এসএমএস বাণিজ্যের কারণে তাদের নির্বাচন পদ্ধতি অগ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়ে ২০০৭ সালের নতুন সপ্তাশ্চর্য্য’র প্রতিযোগিতাটি বিতর্কিত হয়ে পড়েছিল এবং ইউনেস্কো সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলো তাই এবার এই বিশেষ সাবধানতা। তারা চায় না এসএমএস এর ভোটের পরিসংখ্যান গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে আবারো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবারের ব্যবসা ভন্ডুল হয়ে যাক।

কিন্তু থলের বেড়াল তো এরই মাঝে বেড়িয়ে পড়েছে। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে তো ইতোমধ্যেই ২ সপ্তাহের ভোটের পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এখন কী হবে? জানা গেছে ৯ তারিখে সংবাদটি প্রকাশিত হবার পরদিন ১০ জুলাই’তে টেলিটকের চুক্তি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে চিঠি দিয়েছে সেই সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন। তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে চুক্তির শর্ত মোতাবেক এসএমএস এ ভোটের পরিসংখ্যান গোপন রাখতে বলা হলেও কী করে তা বাংলাদেশের একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হলো। এই গোপন-গোপন খেলায় এসএমএস-এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচার করে নেয়ার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই কী করে?

এবার আসুন সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন এর দ্বিতীয় আরেকটি ব্যবসার গোপন কথায়। এই সংগঠনটি লাখ লাখ ডলারের বিনিময়ে বিভিন্ন বেসরকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রচারণা তথা বিজ্ঞাপনের স্পন্সরশিপ বিক্রি করছে। অর্থাৎ যদি কোন বেসরকারী বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তার দেশের প্রতিযোগী কোন একটি স্থানকে নির্বাচিত করার জন্য দেশে কিম্বা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারণা চালাতে চায় তাহলে সেজন্য সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন এর কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে তার অধিকার লাভ করতে হবে। এজন্য তারা দুই ধরণের স্পন্সরশিপ এর ব্যবস্থা রেখেছে। ২ লাখ ১০ হাজার ডলারের বিনিময়ে গোল্ড স্পন্সরশিপ এবং ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে প্লাটিনাম স্পন্সরশিপ।

যেমন কোরিয়ার জোজু দ্বীপের জন্য দেশটির দুটি স্বনামধন্য কোম্পানি হুন্দাই কর্পোরেশন এবং কিয়া মটরস মোটা টাকার বিনিময়ে স্পন্সরশিপ কিনেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সুখবরটি হলো আমাদের দেশের কোন কোম্পানি সংগঠনটির কাছ থেকে এখন পর্যন্ত স্পন্সরশিপ কেনেনি। কিন্ত দেশের অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানই সুন্দরবনকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। কিন্তু স্পন্সরশিপ না কিনে এই প্রচারণা চালালে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন এর নিয়ম অনুযায়ী, চুক্তির শর্ত ভঙ্গের দায়ে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়বে সুন্দরবন। বিষয়টি সুন্দরবনের সরকারী সমর্থক সংস্থা বাংলাদেশ পর্যটন সংস্থার নজরে এসেছে এবং স্পন্সরশিপ বিহীন এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সুন্দরবনের জন্য প্রচারণা না চালাতে সতর্ক করে দিতে চিঠি ইস্যু করছে।

কিন্তু এরপর বাংলাদেশের এক বা একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যদি এই প্রচারণার জন্য স্পন্সরশিপ কেনে তবে দুই লাখ ১০ হাজার কিম্বা সাড়ে তিন লাখ ডলার করে প্রতি স্পন্সরশিপ বেচে বাংলাদেশ থেকে হাতিয়ে নেবে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন তথা বার্নার্ড ওয়েবার। আর প্রতিযোগিতার ফাইনালিস্ট ২৮টি দেশের মধ্যে যদি গড়ে একটি করে স্পন্সরশিপ বিক্রি করতে পারে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন তবে এই খাত থেকে তার আয় দাড়াবে গড়ে ১০০ কোটি টাকা। আর প্রতিযোগী ২৮টি দেশের প্রত্যেকটি থেকে যদি ৫০ কোটি করে এসএমএস ভোট পায় তবে এই খাত থেকে বার্নার্ড আয় করবে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (প্রতি এসএমএস ৬৮ পয়সা হিসাবে)। কিন্তু ধনী দেশেগুলো থেকে এসএমএস এবং ফোন ভোটের মাধ্যমে পাওয়া হিস্যা আরো বেশি হবে। সেক্ষেত্রে বার্নার্ড ওয়েবারের মুনাফার পরিমান হবে আরো বেশি। আহ্ তথ্য প্রযুক্তি আর নতুন আইডিয়া; এই দুই যদি মিলে যায় খাপেখাপ তবে তাকে আর ঠেকায় কে?

তাহলে কী দাড়াচ্ছে? বার্নার্ড ওয়েবারের ওয়েবে তথা ধান্দাবাজীর জালে ধরা পড়েছি আমরা। এই মানুষটি পাঁচ বছর আগে ২০০৭ সালে কক্সবাজার ও সুন্দরবনকে পৃথিবীর অন্য ৪৪০টি স্থানের মধ্যে রেখে শুরু করেছিল পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন প্রতিযোগিতা। আর আমরা দেশ দরদী হয়ে, পৃথিবীর বুকে নিজের সুন্দরবনকে জায়গা করে দেয়ার এক ভ্রান্ত বাসনা থেকে সেই জালে আমরা পা দিয়েছি আমরা।

ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে দুই বছর ধরে ইন্টারনেটে ভোট দেয়ার পর ২০০৯ সালে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন বললো যে কক্সবাজার বাদ পড়েছে প্রতিযোগিতা থেকে আর সুন্দরবন টিকে গিয়েছে। শেষ ধাপের এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের আরো ২৮টি প্রাকৃতিক স্থানও রয়েছে। এখন এসএমএস এবং ইন্টারনেটে ভোটাভুটির পর ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর বার্নার্ড ঘোষণা করবে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়া ২৮টির মধ্য থেকে ৭টি শ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক স্থানের নাম।

কিন্তু এই সপ্তাশ্চর্য হবে কীসের বিচারে? স্থানটির সৌন্দর্য্য বিচারের মাধ্যমে? স্থানটির বিশেষ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ঠ্যের কারণে? স্থানটির জীব বৈচিত্র্যের কারণে? না এগুলো কোনটাই না। শ্রেষ্ঠত্ব বিচার হবে শ্রেফ টাকার বিনিময়ে। এসএমএস আর স্পন্সরশিপ কেনার মাধ্যমে যে ৭টি দেশ বার্নার্ড ওয়েবারের সুইস ব্যাংকের একাউন্টে সবচেয়ে বেশি ডলার রাখতে পারবে, এমন সাতটি দেশের প্রাকৃতিক স্থানই এগিয়ে যাবে প্রতিযোগিতায়। হবে পৃথিবীর তথাকথিত সেরা ৭টি প্রাকৃতিক আশ্চর্যজনক স্থানের একটি। অন্যদের ভ্রান্ত ও অগ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিয়ে নিজের পকেট ভরার কী আয়োজন! সত্যি সেলুকাস; এ পৃথিবী অবাক চেয়ে রয়!!!

তাই যে কথাটি আবারো বলতে চাই তা হলো; আমাদের সুন্দরবনের জন্য কারো সার্টিফিকেটের প্রয়োজন নেই। কারণ সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আর জাতিসংঘ তথা ইউনেস্কো সুন্দরবনকে ১৯৯৬ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই আমাদের সুন্দরবন সেভেন ওয়ান্ডর্স ফাউন্ডেশনের মতো একটি ভুঁইফোড় এবং অস্বীকৃত সংগঠনের ব্যবসার উপাদানে পরিণত তা কোনভাবেই মেনে নিতে পারিনা

সূত্রঃ ফেবু নোট

 

ইন্দোনেশিয়াকে আক্রমণ করেছে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজক হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ায় ইন্দোনেশিয়াকে আক্রমণ করে বসেছে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন। এমনই খবর বেরিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার প্রভাবশালী পত্রিকা দি জাকার্তা গ্লোব এ। সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন এর মালিক বার্নার্ড ওয়েবার আগামী ১১ নভেম্বর ২০১১ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার অনুষ্ঠানের আয়োজক হতে ইন্দোনেশিয়ার সরকারকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানায়। কিন্তু জাকার্তা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, এই ফালতু কাজে টাকা খরচ করার কোন কারণ দেখছেন না তারা। আর তাদের বাজেটের টাকা খরচ করার আরো অনেক প্রয়োজনীয় খাত রয়েছে। সেদেশের পর্যটন মন্ত্রণালেয়র এক উর্ধতন কর্মকর্তা ডি পিতানা এ ব্যাপারে আরো বলেছেন; ‘সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন ফিফা বা অলিম্পিক এসোসিয়েশনের মতো আন্তর্জাতিকভাবে কোন স্বীকৃত সংগঠন নয়’। তাই তাদের নির্বাচন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কোন প্রভাব ফেলবে না। আর যুক্তিসঙ্গত এসব কারণে সেভেন ওয়ান্ডার্স এর এই আবদার প্রত্যাখ্যান করায় ইন্দোনেশিয়ার কমোদো ন্যাশনাল পার্ককে সংগঠনটি প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের প্রতিযোগিতার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়।

সূত্রঃ ফেবু নোট

 

মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়াকে আক্রমন করেছে সেভেন ওয়ান্ডর্স ফাউন্ডেশন!!! নেক্সট টার্গেট বাংলাদেশ???

নির্বাচন প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, মোটা অংকের টাকা দাবি এবং সর্বোপরি জাল ভোটের (এসএমএস, ফোন এবং

ওয়েবে যতখুশী তত ভোটের বিধান) নির্বাচন করায় মালদ্বীপ সরকার গত ১৭ মে ২০১১ তে তাদের

মন্ত্রীসভার বৈঠকে সেভেন ওয়ান্ডার্স নির্বাচন প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের দেশকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। চিঠি মারফত সরকারী সেই সিদ্ধান্তের কথা ফাউন্ডেশনের মালিক বার্নার্ড ওয়েবারকে জানিয়েও দেয়। কিন্তু এর প্রতিউত্তোরে সংগঠনটি বলেছে; “মালদ্বীপ এখনও প্রতিযোগিতায় রয়েছে। কারণ কোন দেশ এই প্রতিযোগিতায় থাকবে কি থাকবে না তার একক সিদ্ধান্ত নেয়ার কর্তৃত্ব সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের। কোন সরকারী এজেন্সি তথা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কোন এখতিয়ার নেই।”!!! (Geneva-based foundation’s head of communications, Eamonn Fitzgerald, that the Maldives was till in the competition “because the authority to withdraw a participant from the campaign is a decision for New7Wonders alone, not for any government agency.”)

 

একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি সেভেন ওয়ান্ডার্স কর্তৃপক্ষের এমন অবজ্ঞা প্রদর্শন ও রুদ্রমূর্তি দেখে সেদেশর পর্যটন অঙ্গসংস্থা  The Maldives Marketing and PR Corporation (MMPRC) একে বিবেচনা করছে “মালদ্বীপের স্বার্বভৌমত্বের অধিকারের ক্ষুন্ন করেছে” (New7Wonders “infringing sovereign rights of Maldives” by keeping country in competition, claims MMPRC)  হিসেবে।  

 

আর তাই সেদেশের সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে; “গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একমাত্র মালদ্বীপ সরকারই তার দেশ ও জনগণের জন্য কিছু করার বৈধ কর্তৃপক্ষ, অন্য কেউ নয়।” কিন্তু এতকিছুর পরও মালদ্বীপ সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে; সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন মালদ্বীপকে তাদের তথাকথিত নির্বাচনের শেষ ধাপ ২৮ চূড়ান্ত প্রতিযোগীর তালিকায় রেখে দিয়েছে !!!

 

আর আমরা??? আমরাও স্বাধীন দেশ। আমাদের সরকারও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত। কিন্তু আমরাই কিনা আমাদের দেশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্থান ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবনকে একটি অস্বীকৃত আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের ব্যবসার উপাদানে

পরিণত করেছি!!!

 

আর মালদ্বীপের মতো যদি আমাদের সরকারও যদি এই সত্য উপলব্ধিপূর্বক সিদ্ধান্ত নেয় তথাকথিত এই প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসার; সেক্ষেত্রে আমাদেরকেও একই গ্লানীকর পরিণতি ভোগ করতে হবে। বার্নার্ড ওয়েবার সেদিন মালদ্বীপের মতো বাংলাদেশ সরকার তথা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বদর্পে বলবে; তুমি কোন সরকার হে…তুমি কোন দেশ হে…তোমাকে থোড়াই কেয়ার করি আমি! তোমার সুন্দরবন প্রতিযোগিতার তালিকায় থাকবে কি থাকবে সেটা ঠিক করব আমি, বাংলাদেশ সরকার তুমি কেউ না এটা ঠিক করার!!! একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতি এতবড় স্পর্ধা, ধৃষ্টতা ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে পারে যে সংগঠন; তার নির্বাচিত প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য কী আদৌ গ্রহণযোগ্য হবে বিশ্ববাসীর কাছে???  

 

বিস্তারিত পড়ুন: http://minivannews.com/politics/new7wonders-%E2%80%9Cinfringing-sovereign-rights-of-maldives%E2%80%9D-by-keeping-country-in-competition-claims-mmprc-20658

 

ইন্দোনেশিয়াকেও আক্রমণ করেছে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজক হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ায় ইন্দোনেশিয়াকে আক্রমণ করে বসেছে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন। এমনই খবর বেরিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার প্রভাবশালী পত্রিকা দি জাকার্তা গ্লোব এ। আর ইন্দোনেশিয়ার আরেক প্রভাবশালী দৈনিক জাকার্তা পোস্ট এ জানা গেছে সেই অনুষ্ঠান আয়োজনে খরচ হতো ৪৫ মিলিয়ন ডলার!!! সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন এর মালিক বার্নার্ড ওয়েবার আগামী ১১ নভেম্বর ২০১১ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার অনুষ্ঠানের আয়োজক হতে ইন্দোনেশিয়ার সরকারকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানায়। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া সরকার স্পষ্ট  জানিয়ে দেয়, এই ফালতু কাজে ৪৫ মিলিয়ন ডলার (সাড়ে চার কোটি ডলার বা ৩৩০ কোটি টাকা) খরচ করার কোন কারণ দেখছেন না তারা। আর তাদের বাজেটের টাকা খরচ করার আরো অনেক প্রয়োজনীয় খাত রয়েছে। সেদেশের পর্যটন মন্ত্রণালেয়র এক উর্ধতন কর্মকর্তা ডি পিতানা এ ব্যাপারে আরো বলেছেন; ‘সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন ফিফা বা অলিম্পিক এসোসিয়েশনের মতো আন্তর্জাতিকভাবে কোন স্বীকৃত সংগঠন নয়’। তাই তাদের নির্বাচন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কোন প্রভাব ফেলবে না। আর যুক্তিসঙ্গত এসব কারণে সেভেন ওয়ান্ডার্স এর এই আবদার প্রত্যাখ্যান করায় ইন্দোনেশিয়ার কমোদো ন্যাশনাল পার্ককে সংগঠনটি প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের প্রতিযোগিতার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়।  http://www.thejakartaglobe.com/home/indonesia-under-attack-by-new7wonders-foundation-tourism-ministry/423012

http://www.thejakartapost.com/news/2011/02/05/issue-komodo-suspension-new7wonders.html

সূত্রঃ ফেবু নোট

 

 

একটি সত্যানুসন্ধান: প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন

প্রায় সকলেই এখন মানছেন যে নাম-ঠিকানা বিহীন (www.new7wonders.com এ সংগঠনটির কোন মেইলিং/ফোন/ফ্যাক্স/ই-মেইল ঠিকানা নেই) নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ডট কম একটি অস্বীকৃত এবং প্রতারক প্রতিষ্ঠান যারা মানুষের দেশপ্রেমকে ব্ল্যাকমেইল করে বিলিয়ন ডলার উপার্যনের ধান্দা করছে। কিন্তু এরপরও কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে ধান্দাবাজ হোক আর প্রতারক হোক, এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বে পরিচিতি পাচ্ছে আমাদের সুন্দরবন। কিন্তু কেমন পরিচিতি পাচ্ছে তা আলেক্সা’র এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে।

Visitors by Country for New7wonders.com: Country Percent of Site Traffic

Bangladesh 30.3%

United States 10.6%

India 7.7%

Venezuela 5.2%

Japan 4.8%

China 4.7%

Philippines 3.2%

South Africa 3.1%

Mexico 3.1%

Poland 2.8%

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার মাত্র ৩.২%;  অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি হওয়ার পরও বাংলাদেশ থেকে সেভেন ওয়ান্ডার্স ডট কম ওয়েব সাইটটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার (৩০.৩%) করেছে বাংলাদেশ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা কয়েকটি দেশের অন্যতম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও (৭৭%) এক্ষেত্রে হার মানিয়েছি আমরা! আর ওয়েব সাইটটিতে দেশটির ১০.৬% ভিজিটরের মধ্যে খোঁজ নিলে হয়ত দেখা যাবে এর সিংহভাগ ভিজিটরই বাংলাদেশী ইমিগ্র্যান্ট। আর ভারত থেকে এ পর্যন্ত ঐ সাইটে ভিজিট হয়েছে মাত্র ৭.৭%। অর্থাৎ প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্রাবনকারী নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ডট কম নামের এই ওয়েব সাইটে ভিজিটের দিক থেকে ভারতের চেয়ে আমরা ২২. ৬% এগিয়ে। যদিও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দেশ বাংলাদেশ (৩.২%)। সেভেন ওয়ান্ডার্স ডট কম ভিজিট করে মাত্র ৩.২% ব্যাবহারকারীই (যদিও সব ইন্টারনেট ব্যবহারকারীই যে সেভেন ওয়ান্ডার্স এর ওয়েব সাইট ভিজিট করেছে তা নয়) হার মানিয়ে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীনের মতো দেশকে যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার বিশ্বের সর্বোচ্চ (ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হারের দিক থেকে বিশ্বে সবেচেয়ে এগিয়ে চীন, দ্বিতীয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তৃতীয় জাপান এবং চতুর্থ ভারত)। অর্থাৎ আলেক্সা’র (এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বে কোন ওয়েব সাইটে কত ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ভিজিট করে তার পরিসংখ্যান প্রকাশ করে) এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে বিশ্বের সামনে আবারো আমরা হুজুগে জাতি হিসেবে নিজেদের আরো একবার প্রমাণ করেছি!!!

তাহলে সবমিলিয়ে বিষয়টা দাড়াচ্ছে; বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ক্ষুদ্র ইন্টারনেট ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠীর দেশ হয়েও পৃথিবীর সবচেয়ে বেশিবার (৩০.৩%) সেভেন ওয়ান্ডার্স ডট কম ভিজিট করেছে। এ থেকে আরো একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন প্রতিযোগিতায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ভোটও দিয়েছে এই বাংলাদেশীরাই (কারণ এই ওয়েব সাইটে ঢোকার মূল উদ্দেশ্য পছন্দের স্থানকে ভোট দেয়া)। এটি আরো প্রমাণ করছে ইন্টারনেট ভিত্তিক প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে সুন্দরবনের মূল প্রচারণা বাংলাদেশীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কারণ এই ওয়েব সাইটে বিরচরণকারীর হারের দিক থেকে আমাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও আমাদের থেকে অনেক পিছিয়ে (-১৯.৭%) পিছিয়ে; কারণ ঐ দেশ থেকে ভিজিট হয়েছে ১০.৬%। এদিকে, প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে ভারত সুন্দরবনের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও সেদেশ থেকে ওয়েব সাইটে বিচরণ করেছে মাত্র ৭.৭% ভারতীয়। আর সেভেন ওয়ান্ডার্স ডট কম-এ পৃথিবীর মোট বিচরণকারীর প্রায় এক তৃতীয়াংশই (৩০.৩%) বাংলাদেশী!

তাই এক কথায় বলা যায়; প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে অংশ নিয়ে পৃথিবীতে বাংলাদেশীরাই সবচেয়ে বেশী মেতেছে বা হুজুগে মেতেছে। আর যারা মনে করছে এর মাধ্যমে বিশ্বে সুন্দরবন পরিচিতি পাচ্ছে তারাও ভুল করছে। কারণ এই ওয়েব সাইটটির ব্যবহারকারীর প্রায় এক তৃতীয়াংশই বাংলাদেশী। অর্থাৎ আমরা নিজেদের ঢোল নিজেরাই পেটাচ্ছি; আর বিশ্বের খুব কম মানুষই তা শুনছে।

http://www.alexa.com/siteinfo/new7wonders.com

http://www.internetworldstats.com/top20.htm

সূত্রঃ ফেবু নোট

 

 

প্রচ্ছদ রচনা : প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের সপ্তকাণ্ড

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের সপ্তকাণ্ডদেশজুড়ে জোয়ার বইছে ভোটের। ভোটপ্রার্থীর নাম সুন্দরবন, ভোট নিচ্ছে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন বলে একটি সংস্থা। সপ্তাশ্চর্যের জন্য ভোটগ্রহীতা এই সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন নিজেই একটি আশ্চর্য। এর কোনো দায়বদ্ধতা নেই, স্বচ্ছতা নেই, এমনকি একটি অফিসের ঠিকানা পর্যন্ত সহজলভ্য নয় কোথাও। ই-মেইল ভোট ছাড়িয়ে এখন শুরু হয়েছে এসএমএসে ভোট দেওয়া। ২০০ কোটি টাকার মোবাইল ব্যালান্স শেষ হচ্ছে বাঙালির। সেভেন ওয়ান্ডার্সের এই প্রতিযোগিতা আসলে কী? এর কি কোনো আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আছে, নাকি শুধুই এক ‘বুদ্ধিমান’ লোকের টাকা বানানোর ভেলকিবাজি? প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন এবং বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন অনিক শাহরিয়ারএকসময় ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হলে টাকার প্রয়োজন পড়ত। টাকাকড়ি না হলে ব্যবসা শুরু করা ছিল বেশ কষ্টের। অল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করেও যাঁরা সেকালে বড়লোক হয়েছেন, তাঁদেরও ব্যবসায় প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে।

কিন্তু আজকাল ব্যবসা হয়ে পড়েছে বুদ্ধিনির্ভর। শুধু বুদ্ধির জোরেই অনেকে কামিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। সেই বুদ্ধিটা যে সৎ বুদ্ধি, এমনটা নয় বেশির ভাগ সময়ই। তবে বুদ্ধি থাকলে টাকা কামিয়ে নেওয়া আজকাল তেমন কোনো ব্যাপারই নয়। এ জন্য মাঝেমধ্যেই শোনা যায়, চাঁদে জমি বিক্রি থেকে শুরু করে প্যারিসের গোটা আইফেল টাওয়ার লোহালক্কড়ের দোকানদারের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল চালাকরা। ডটকম যুগ শুরু হওয়ার পর শুধু একটি ওয়েবসাইটকে সম্বল করেই অনেকে মিলিয়নেয়ার হয়েছে পাশ্চাত্য দেশে। এর জন্য প্রয়োজন পড়েছে শুধু আইডিয়া আর দক্ষ মার্কেটিংয়ের। পণ্য উৎপাদন নয়, বরং মার্কেটিং বা বিপণনই হয়ে পড়েছে এ যুগের লাভজনক ব্যবসা।

আইডিয়া নিয়ে ব্যবসা করার এই যুগে সর্বশেষ সংযোজন সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন। মাত্র একটি ওয়েবসাইটকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন সুইস বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক বার্নার ওয়েবার। যেমন-তেমন ব্যবসা নয়, হুজুগ তৈরিতে তাঁর অসাধারণ দক্ষতায় মেতেছেন বিশ্বের বড় বড় রাজনীতিবিদ আর রাষ্ট্রনায়করা পর্যন্ত। প্রভাবশালী মিডিয়াও লুফে নিয়েছে এই আইডিয়া। পৃথিবীর নতুন সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের নামে এর আগে সেই পুরনো তাজমহল আর চিনের গ্রেটওয়ালেরই আবার নাম ঘোষণা করে মাঝখান থেকে বেশ টাকাকড়ি কামিয়ে নিয়েছেন এই বুদ্ধিমান।

মানুষের তৈরি সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন শেষে তিনি ব্যবসা প্রসারিত করেছেন প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের দিকে। এখানেও তাঁর কোনো অবদান থাকবে না, শুধু এসএমএস আর বিজ্ঞাপনের টাকা থেকে কত টাকা যে কামিয়ে নেবেন, সেটা ভেবে কূল পাচ্ছে না কেউ। সুইস ব্যাংকে টাকা রাখলে যেমন হিসাবের বাইরে রয়ে যায়, সুইস কম্পানি সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের আয়ব্যয়ের হিসাবও তেমনই রয়ে গেছে সব মানুষের অজ্ঞাত।

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের হুজুগ

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের আগে ওয়েবার শুরু করেছিলেন বিশ্বের মানবসৃষ্ট সপ্তাশ্চর্য ঘোষণার কাজ। সেই কাজেও এবারের মতোই প্রায় দুই বছরের প্রচার-প্রপাগান্ডা চলে। সেই প্রচারের হুজুগে যোগ দেন বড় বড় রাষ্ট্রনায়কও। নিজেদের দেশের পক্ষে তাঁরা ভোট চেয়ে বেড়ান। তারপর ২০০৭ সালের ৭ জুলাই পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে ঘোষিত হয় মানবসৃষ্ট সপ্তাশ্চর্যের তালিকা। সেই তালিকায় তাজমহল কিংবা চীনের গ্রেটওয়াল আগের মতোই থাকলেও বাদ পড়ে যায় মিসরের পিরামিড! পিরামিড বাদ পড়ে গেলেও ওয়েবার যে ভালোই ব্যবসা করেছেন, তা বোঝা গেল সেই অনুষ্ঠানেই তিনি যখন ঘোষণা দিলেন প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের। কিছুদিন পরই গুছিয়ে নিয়ে তিনি সেই কাজও শুরু করে দিলেন। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের আয়োজন শুরু হলো ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে। প্রথমেই মনোনয়নপ্রক্রিয়া। বিশ্বের ২২০টি দেশের ৪৪০টি প্রাকৃতিক স্থানের নাম ঝুলিয়ে দেওয়া হলো ওয়েবারের ওয়েবসাইটে। সেই স্থানগুলোর মধ্য থেকে মনোনয়ন দিতে হবে পছন্দের স্থানগুলোর। এভাবেই চলল ২০০৯ সালের ৭ জুলাই পর্যন্ত। ২৮ জুলাই ই-মেইল ভোটে এগিয়ে থাকা ৭৭টি স্থানের মধ্য থেকে সংক্ষিপ্ত করে আনা হয় ২৮টিতে। বর্তমানে এই ২৮টি স্থানের ওপর ভোটগ্রহণ চলছে।

সপ্তাশ্চর্যে কঙ্বাজার পর্ব

মানবসৃষ্ট সপ্তাশ্চর্যে বাংলাদেশের কোনো স্থাপনার নাম না থাকলেও প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের প্রাথমিক তালিকায় স্থান পায় বাংলাদেশের কঙ্বাজার। এর পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে সুন্দরবনের নামও ঠাঁই পেয়েছে। তালিকায় নাম ওঠার পর বাংলাদেশ থেকে জোর দেওয়া হয় কঙ্বাজারকে জিতিয়ে আনতে। এমনিতেই কঙ্বাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হিসেবে বিশ্বের একটি বড় প্রাকৃতিক সম্পদ। তা ছাড়া সুন্দরবনের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে অংশীদারি থাকায় নিজেদের একক সম্পদ হিসেবে কঙ্বাজারের দিকেই ঝুঁকে পড়ে বাংলাদেশ। এখানেই শুরু হয় প্রাথমিক হুজুগ। যে দেশের খুব কম লোকই জীবনে কোনো দিন কম্পিউটার ছুঁয়ে দেখেছে, সেই দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ই-মেইল পাঠানো শুরু হয়!

নিজের দেশের সম্পদকে জিতিয়ে আনতে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিরা নিরন্তর চেষ্টা চালাতে থাকেন। এর মধ্য ধুয়া দেয় কিছু মিডিয়া। রাস্তাঘাট, বইমেলা-বাণিজ্য মেলায় বুথ বসিয়ে ভোট চলতে থাকে কঙ্বাজার আর সুন্দরবনের পক্ষে, মূলত কঙ্বাজারের পক্ষেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ক্লাব-সমিতি তো বটেই, এমনকি বাংলাদেশ পুলিশ পর্যন্ত আয়োজন করে ভোট দিয়েছে কঙ্বাজার আর সুন্দরবনের জন্য। পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার করা হতে থাকে ভোটের প্রতি সপ্তাহের অবস্থান। সেই অবস্থান খুব কম সময়েই শীর্ষ পাঁচের বাইরে গেছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সবাই ধরে নিয়েছিল যে কঙ্বাজার ২৮ ফাইনালিস্টের মধ্যে থাকবে।

কিন্তু ২০০৯ সালের ২৮ জুলাই যে তালিকা প্রকাশিত হয়, সেই তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায় কঙ্বাজার! কেন বাদ পড়ে যায়, কী যোগ্যতার অভাবে, সেটা আয়োজক কম্পানি কাউকে প্রকাশ করে না। কম্পানির পক্ষ থেকে ফাইনালিস্ট তালিকা করার জন্য যে প্যানেল করা হয়, সেই প্যানেল কোনো রকম কারণ না দেখিয়েই কঙ্বাজারকে তালিকা থেকে বাদ করে দেয়। কারা এই প্যানেলের সদস্য? না, বিশ্বখ্যাত কোনো ব্যক্তিরা নন। বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ। ভুঁইফোড় সংগঠনের উদ্যোক্তা, নয়তো ফটোগ্রাফার। প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে অবশ্য ইউনেসকোর এক সাবেক মহাপরিচালককে বসিয়ে দিয়ে প্যানেলের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই প্যানেল কোন যোগ্যতায় প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের ফাইনালিস্ট ঠিক করল, সে ব্যাপারে আয়োজক প্রতিষ্ঠান কখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

২৮টি স্থান নিয়ে ব্যবসা শুরু

বাংলাদেশ থেকে ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা দক্ষ বিপণন দিয়ে হুজুগ তৈরি করার পর এবার শুরু হয়েছে আবারও সেই হুজুগকে নগদে পরিণত করার খেলা। সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান-কাম-সংগঠনটি ই-মেইলের পরিবর্তে মোবাইল ফোনের এসএমএসে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি চালু করেছে। বাংলাদেশে এই নতুন ভোটদানপদ্ধতি চালু হয় গত ২৩ জুন। এদিন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ নিজের মোবাইল ফোন থেকে এসএমএস পাঠিয়ে এই পদ্ধতিতে ভোটদান আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের দেশে কম করে হলেও পাঁচ কোটি মোবাইল ফোন গ্রাহক আছেন। তাঁরা প্রত্যেকে ২০টি ভোট দিলে ১০০ কোটি ভোট হবে। আর এই ভোট সুন্দরবনকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।’ লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রথম থেকে এ-সংক্রান্ত প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে থাকলেও ধীরে ধীরে তারা পেছনের সারিতে পড়ে গেছে। এদিনের অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রী জাতীয় পার্টির নেতা জি এম কাদেরকে অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি।

ড. হাছান মাহমুদের কথামতো যদি বাংলাদেশ থেকে ১০০ কোটি এসএমএস করা হয়, তাহলে ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই ২০০ কোটি টাকা কে পাবে? মজার ব্যাপার এখানেই। ২০০ কোটি টাকা থেকে মোবাইল ফোন কম্পানিগুলো খরচ হিসেবে একটা অংশ নিলেও বড় অংশটি পাবে সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন, যে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশিদের আবেগের মূল্য দেয়নি। বিনা মূল্যের ই-মেইলে কঙ্বাজারকে এগিয়ে রাখলেও তারাই এখন ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা ফেঁদে বসেছে এই গরিব দেশে!

হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা

বাংলাদেশের মতো একটি গরিব দেশ থেকেই যদি ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা হাতিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে অন্য স্থানগুলো থেকে যে ব্যবসা আরো ভালো হবে, সে কথা বলাই বাহুল্য। এক সুন্দরবনের ক্ষেত্রেই তো ভারতের ভোট এই ২০০ কোটি টাকার মধ্যে হিসাব হলো না। তবু ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা লক্ষ্যমাত্রা যদি প্রতিটি স্পটের জন্য করা হয়, তাহলে ওয়েবার ২৪টি স্পট থেকে মোট চার হাজার ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসা করে নিতে পারবেন। এরপর তো প্রচারস্বত্ব বিক্রিসহ আরো অনেক ধরনের আয় রয়েই গেছে, যেগুলোর মোট মূল্য আরো কয়েক হাজার কোটি টাকায় গড়াতে পারে।

সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন

ভাঁওতাবাজির সংগঠন

সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন আসলে কী? তারা নিজেরাই নিজেদের ওয়েবসাইটে স্বীকার করেছে যে এটি একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান-কাম-সংগঠন। সংগঠন হলে এর সদস্য কারা, এটি কিভাবে পরিচালিত হয়? না, এ রকম কোনো প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে না কোথাও। এদের অফিস কোনখানে অবস্থিত? মজার ব্যাপার হচ্ছে, এদের আদৌ কোনো অফিস আছে কি না, তাও নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই। নেহাতই একটি ওয়েবসাইটকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই প্রতিষ্ঠানটিই হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে একেক আয়োজন থেকে। এই সংস্থার আয়ব্যয়ের কোনো হিসাব কোথাও প্রকাশিত হয়নি। তারা কিভাবে কত টাকা আয় করেছে এবং কিভাবে সেগুলো ব্যয় করবে, সে ব্যাপারেও কোনো ঘোষণা দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির প্রচারে কিছু কৌশল আছে। এরা জাতিসংঘের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্কযুক্ত নয়, কিন্তু তাদের কথাবার্তায় কিছুটা ধোঁয়াশা আছে। সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন নিজেদের ফিফা কিংবা অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মতো সংগঠন হিসেবেও দাবি করে থাকে। কিন্তু ফিফা কিংবা অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে সদস্যপদ নিতে হয়, সেখানে রীতিমাফিক নির্বাচন হয় এবং সদস্যদের পরিচিতি প্রকাশ্যে আছে। অথচ ওয়েবারের প্রতিষ্ঠানে এ রকম কোনো কিছুর বালাই নেই। ওয়েবসাইট ঘেঁটে যা বোঝা যায়, তিনি নিজেই এককভাবে প্রতিষ্ঠানটি চালান, নিজেই এর হর্তাকর্তা। কেউ তাঁকে নির্বাচিত করেনি, দায়িত্বও দেয়নি। কিন্তু নিজ উদ্যোগেই তিনি মানুষের মধ্যে হুজুগ তৈরি করে হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন।

টাকা কামানোর সুযোগ না দিলে

বার্নার্ড ওয়েবার যা করছেন

ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ মানুষ কিছু বোঝার আগেই তাদের কমোডো ন্যাশনাল পার্কের অফিশিয়াল সমর্থক হিসেবে ইন্দোনেশিয়া সরকারকে বাদ দিয়ে দেয় সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন। প্রতিযোগিতার রীতি অনুযায়ী, অফিশিয়াল সমর্থক না থাকলে এমনিতেই স্থানটি প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন কমোডো ন্যাশনাল পার্ককে ফাইনালিস্ট হিসেবে রেখে দেয়। অবশ্য নিয়ম তারাই তৈরি করে এবং তারাই যখন ইচ্ছা নিয়ম পরিবর্তন করার অধিকার রাখে। তখনই ধারণা করা হয়েছিল, ইন্দোনেশিয়া সরকারকে কোনো ধরনের চাপ দেওয়ার জন্যই ওয়েবার এ কাজটি করেছেন। ঘটনার পেছনের ঘটনা জানিয়ে দেয় ইন্দোনেশিয়ার সরকার। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জানায়, প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য ঘোষণার আনুষ্ঠানিক হোস্ট হতে ইন্দোনেশিয়া অস্বীকার করায়ই তাদের প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া জানায়, এই প্রতিযোগিতার হোস্ট হওয়ার জন্য ওয়েবার তাদের কাছে ৪৫ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৪ কোটি টাকা) দাবি করেছেন এবং ইন্দোনেশিয়া সরকার এ টাকা দিতে রাজি হয়নি। ইন্দোনেশিয়া তাদের দেশের সম্মানহানির অভিযোগ তুলে এ সময় সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে মামলা করারও হুমকি দেয়।

মালদ্বীপও টাকা দেয়নি

গত ১৭ মে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে প্রচারিত দেশটির নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা গেছে, মালদ্বীপও এই ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ২৪ এপ্রিল মালদ্বীপের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা গেছে। মালদ্বীপের পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওয়েবার খুব উচ্চমূল্যের লাইসেন্স ফি এবং স্পনসরশিপ প্যাকেজ বিক্রি করতে চাইলে মালদ্বীপ এই সিদ্ধান্ত নেয়। মালদ্বীপের বক্তব্য খুব স্পষ্ট। তারা বলেছে, সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের কাজকর্মে কোনো স্বচ্ছতা নেই এবং প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার সময় এ রকম কোনো টাকার দাবি তাদের জানানো হয়নি। সুতরাং তারা এই ব্যবসায়ী উদ্যোগে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে আগ্রহী নয়।

বাংলাদেশ কি টাকা দিয়েছে? কত দিয়েছে?

ইন্দোনেশিয়া আর মালদ্বীপের ঘটনার পর এ কথা স্পষ্ট যে ওয়েবার শুধু মানুষের মোবাইল ফোনের ব্যালান্স শেষ করেই ক্ষান্ত হন না, বরং এটা তাঁর ব্যবসার একটি অংশ মাত্র। মালদ্বীপ উচ্চমূল্যের লাইসেন্স ফি দেয়নি, সুতরাং তারা প্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বাংলাদেশ নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়নি, বরং এই প্রতিযোগিতায় বড় আকারে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ওয়েবারের এই প্রতিযোগিতায় সুন্দরবন বিজয়ী হলে রাজনৈতিক দল হিসেবে সরকারি দল বাড়তি সুবিধা পাবে। এই জনপদে বিদেশি ডিগ্রি, খেতাব_এসবের কদর আছে। অনেক রাজনৈতিক নেতাকেই এসবের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত দুর্বল হতে দেখা যায়। দেশের একমাত্র নোবেল পুরস্কারটিও কার কার পাওয়া উচিত ছিল, এ নিয়ে তর্কবিতর্ক চলে। এ ক্ষেত্রে সেভেন ওয়ান্ডার্স হিসেবে সুন্দরবনকে তালিকাভুক্ত করতে সরকারি উদ্যোগ থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কত টাকার বিনিময়ে প্যাকেজ কিনেছে বাংলাদেশ? ২০০ কোটি টাকার এসএমএসের বাইরে সরকারি তহবিল থেকে কত টাকার জোগান দিতে হচ্ছে আমাদের? এ ব্যাপারে সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা উচিত।

সুন্দরবনের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা আর

ভারত-বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সুযোগ

সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড দিনে দিনে প্রকাশিত হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য হিসেবে সুন্দরবন বিজয়ী হলে এর অর্থনৈতিক মূল্য কতটুকু বাড়বে, এটাই এখন বিবেচ্য। এর মাধ্যমে একটি প্রচার পাওয়া যাবে, এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। বিশ্বব্যাপী ইকো ট্যুরিজমের প্রসার ঘটছে, এই সময়ে সুন্দরবন যদি বাড়তি প্রচার পায়, তাহলে তা পর্যটকদের আকৃষ্ট করারই কথা।

কিন্তু বাস্তবে তেমনটা খুব বেশি হবে না মনে হয়। এর কারণ বিবিধ। প্রথম কারণ হচ্ছে সুন্দরবন সফর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের অংশ থেকেও সুযোগ থাকছে। পর্যটকদের কাছে এই উপমহাদেশে ভারতই প্রথম পছন্দ। তাজমহল কিংবা দিলি্লর লালকেল্লার পাশাপাশি ভারতে আছে অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্থান। পাহাড়, নদী, বরফ থেকে মরুভূমি, সমুদ্রসৈকত_সব মিলিয়ে ভারত পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষে। এক তাজমহল থেকেই ভারতের পর্যটন শিল্পের একটা বড় অংশ আয় হয়। সুন্দরবন নতুন করে প্রচার পেলে ভারত একেও পর্যটকদের জন্য উপস্থাপন করতে সচেষ্ট হবে। একই দেশে ঢুকে যদি তাজমহল দেখে গোয়ার সমুদ্রসৈকতে গোসল করে সুন্দরবন দেখে বেড়িয়ে যাওয়া যায়, তাহলে পর্যটকরা বাংলাদেশে প্রবেশ করে সুন্দরবন দেখার জন্য তেমন আগ্রহী না হলে অস্বাভাবিক ব্যাপার হবে না সেটি।

সুন্দরবন এখনই ইউনেসকোর তালিকাভুক্ত বিশ্বসম্পদ। কিন্তু এই প্রচারণা যে সুন্দরবনকে খুব বেশি পর্যটক আকৃষ্ট করছে এমনটি বলা যায় না। আমাদের এখানে অবকাঠামোর অভাব আছে। খুলনা হয়ে সুন্দরবনে যেতে চাইলে দীর্ঘ ক্লান্তিকর ফেরি পার হতে হয়। মুষ্টিমেয় ট্যুর অপারেটর সুন্দরবনে তাদের ট্যুর পরিচালনা করলেও নেহাতই ছোট ছোট লঞ্চে বসে থাকা ছাড়া পর্যটকদের তেমন কিছু করার থাকে না। সুন্দরবনকে ঘিরে আমরা পর্যটকদের জন্য কোনো অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি এখন পর্যন্ত। এ রকম বৈরী পর্যটন এলাকায় বড় আকারের পর্যটক আকর্ষণ করা যায় না।

এর চেয়ে অনেক সহজগম্য স্থান হওয়া সত্ত্বেও কঙ্বাজার আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। গত চারদলীয় জোট সরকারের সময় কঙ্বাজারের খাসজমিকে হোটেল-মোটেল জোন হিসেবে বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে যে দলীয় পছন্দসই লোকদের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেই অপেশাদার লোকরা কঙ্বাজারকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই পাশেই থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়ায় সমুদ্রসৈকতে যে পরিমাণ পর্যটক দেখা যায় যায়, তার ১ শতাংশও আকৃষ্ট করতে পারেনি কঙ্বাজার। অবকাঠামো তৈরি না করলে সুন্দরবন থেকেও তেমন কিছু আশা করা যাবে না।

এই প্রতিযোগিতায় সুন্দরবনের পাশাপাশি নাম আছে আমাজন জঙ্গলের। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই রহস্যময় বনের বেশির ভাগ অংশেই এখনো মানুষের পা পড়েনি। সুতরাং বন হিসেবে সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় একটি আশ্চর্য হিসেবে ঠাঁই পেতে হলে আমাজনের সম্ভাবনাই অনেক বেশি। তবু সুন্দরবনের জন্য বাংলাদেশ লড়ছে। লড়ছে সরকার, মিডিয়া এবং সেই তালে বাংলাদেশের সাধারণ দেশপ্রেমী মানুষও।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কিসের বিনিময়ে? ওয়েবারের পকেটে কত টাকা জোগান দেওয়ার মাধ্যমে? সেই টাকার বিনিময়ে কি আমরা সপ্তাশ্চর্যের এক আশ্চর্য হিসেবে ওয়েবার সাহেবের মন ভজাতে পারব, নাকি আবারও কোনো অন্ধকার কৌশলে কঙ্বাজারের মতোই ছিটকে পড়বে আমাদের সুন্দরবন?

। http://www.kalerkantho.com/?view=details&type=gold&data=Tax&pub_no=600&cat_id=3&menu_id=151&news_type_id=1&index=2&archiev=yes&arch_date=02-08-2011

সূত্রঃ ফেবু নোট

 

সবশেষে অশেষ ধন্যবাদ সত্যকে বের করে আনার জন্য। আর পাঠক গন নিজেই সিদ্ধান্ত নিন কি করবেন।

5 thoughts on “প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য্য প্রতিযোগিতা: মডার্ন ধান্দাবাজী !!!

  • নভেম্বর 11, 2011 at 12:54 অপরাহ্ন
    Permalink

    ভেবে দেখা হয় নি . আপনার পোস্ট দেখে বড়ই মন্ধ লাগিতেসে . অনেক message সেন্ড দিছিলাম

    Reply
    • নভেম্বর 10, 2011 at 7:17 পূর্বাহ্ন
      Permalink

      তামিম সাহেব
      সোজা কথায় বলি ধান্দা করছে আমাদের সরকারি কিছু নীতিহীন মানুশ সাথে মোবাইল অপারেটররা
      আর মূল কালপ্রিট হল সেই নিউ ৭ ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশান

      একটা কাজ করলে পারো
      এই পশ্তটা পারলে ১০জনকে সেন্ড করো আর তাদের বলো যাতে তোমার মত তারা ১০ জনকে অন্তত ১০ জনকে পাথিয়ে পাঠাতে বলে

      Reply
        • নভেম্বর 10, 2011 at 10:28 পূর্বাহ্ন
          Permalink

          না আসলে গত কয়েকদিন অনেক লিঙ্ক শেয়ার হয়েছে
          তাই ফেবু মাইন্ড খাইছে 😛

          Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.